ঢাকা , মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ , ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজশাহী ও নওগাঁয় আলুর বাজারে ধস

আলুর কেজি ৯ টাকা, লোকসানে কৃষকরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১০-০৩-২০২৬ ০১:৫১:৩১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১০-০৩-২০২৬ ০১:৫১:৩১ অপরাহ্ন
আলুর কেজি ৯ টাকা, লোকসানে কৃষকরা ছবি: সংগৃহীত
গত বছরের মতো এবারও রাজশাহী ও নওগাঁর আলুর বাজারে ধস নেমেছে। এতে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। উৎপাদন খরচ ১৮ টাকা হলেও এখন ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। পবা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের আলুচাষি মিঠু হাজীর চোখে এখন শুধুই হতাশা। গত বছর প্রতি কেজি আলুতে ১৫ টাকা লোকসান গুনে ভেবেছিলেন, এবার হয়তো পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবে। সেই আশায় চলতি মৌসুমে ১২ বিঘা জমিতে আবাদ করেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখেন, আগের চেয়েও খারাপ অবস্থা। নওহাটা বাজারে আলু নিয়ে গেলে পাইকাররা দাম হাঁকেন ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি। মিঠু হাজী বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে আমার প্রায় ৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

বর্তমান দামে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না; প্রতি কেজিতে ৯ টাকা লোকসান গুনতে হবে।’ তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে টেন্ডার বাবদ ১৭ হাজার টাকা, বীজ ১২ হাজার, জমি চাষ ৩ হাজার, সার ও কীটনাশক ১২ হাজার, শ্রমিক খরচ ১৩ হাজার, সেচ ও উত্তোলন ৪ হাজার এবং অন্যান্য খরচ ৪ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৬৫ হাজার টাকা। গড়ে প্রতি বিঘায় ৫৫ বস্তা আলু উৎপাদন হয়েছে। প্রতি বস্তায় ৬৫ কেজি হিসেবে মোট উৎপাদন ৩ হাজার ৫৭৫ কেজি। সেই হিসেবে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ১৮ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯ টাকায়।

আলুচাষিদের অভিযোগ, শহরের খুচরা বাজারে আলুর দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও পাইকারি পর্যায়ে সিন্ডিকেট আমদানি বৃদ্ধির অজুহাতে দাম কমিয়ে দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বস্তা নিয়ে অপেক্ষা করেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে ফিরতে হচ্ছে। জেলার পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন হাটে ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার-সবখানেই দরপতনের প্রভাব। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ যেখানে ১৬ থেকে ১৮ টাকা, সেখানে ৮ থেকে ৯ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া মানে নিশ্চিত লোকসান। ভোক্তা পর্যায়ে দাম স্থিতিশীল থাকলেও উৎপাদক পর্যায়ে এই ধস চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। মিঠু হাজীর মতো অনেকেই এখন ভাবছেন, পরের মৌসুমে আদৌ আলু চাষ করবেন কিনা। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত নওগাঁতেও আলুর বাজারে ধস নেমেছে। গেলো বছর সরকার বাজার মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তাতেও উৎপাদন খরচ ওঠেনি। এবার পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। প্রতি কেজি পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ টাকা। যা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম। তবে ভোক্তা পর্যায়ে দাম স্থিতিশীল থাকলেও কৃষক পাচ্ছে না নায্য দাম। সম্প্রতি জেলার হাটগুলো ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

কৃষকরা বলছেন, এ বছর আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ হয়েছে ১৫ টাকার বেশি। বীজ, সার, সেচ আর কীটনাশকেও গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য ৫ থেকে ৭ টাকার বেশি মিলছে না। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উঠছে না আলু উঠানোর শ্রমিক খরচ। তার ওপর হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করা নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টন। গত মৌসুমে জেলায় চাষ হয়েছিল ২৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ টন। সেই হিসাবে এ বছর জেলায় ৩ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু কম চাষ হয়েছে। পত্নীতলা উপজেলার মোবারকপুর এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে জমি থেকে আলু উঠানোর শ্রমিক ও পরিবহন খরচ উঠছে না।’ আরেক কৃষক হুমায়ন বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। প্রতি কেজির উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে জাত ভেদে ৫ থেকে ৭ টাকা কেজিতে।’ মান্দা উপজেলার মৈনম এলাকার কৃষক ইদ্রিস উদ্দিন বলেন, ‘এবার ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। আলু তোলার পর এখনও দাম না থাকায় বিক্রি ও রাখার জায়গা সংকটে ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে পারছি না। হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওযায় সংরক্ষণ করা নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা।’

রানীনগর উপজেলার মিরাট এলাকার বাচ্চু মন্ডল বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। বাজারে দাম না থাকায় এবারও খরচ উঠবে না। কোনো বছর খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়, আবার কোনো বছর সামান্য আয় হলেও তা দিয়ে লোকসানের ঘা শুকায় না। ফলে আগামী বছর অন্য ফসলের চাষ করবো।’ নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও অনেক কৃষক আলু চাষ করেছে। এখন উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে সরবরাহ বেড়েছে বলেই দাম কমেছে।’

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ